গণভোটে জনগণের স্পষ্ট মতামত প্রকাশের পরও তা বাস্তবে কার্যকর না হওয়ার নজির শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে। কোথাও আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায়, কোথাও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে, আবার কোথাও ভোটার উপস্থিতির সীমা পূরণ না হওয়ায় গণভোটের ফল কার্যকর হয়নি। নিচে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরা হলো—
🇬🇧 যুক্তরাজ্য: ব্রেক্সিট-পরবর্তী টানাপোড়েন
২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ‘লিভ’ পক্ষে মত দেন। তবে ফল ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন David Cameron, যিনি ফলাফলের দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। ব্রেক্সিট কার্যকর হতে দীর্ঘ রাজনৈতিক দরকষাকষি, সংসদীয় বাধা এবং আইনি প্রক্রিয়া পার করতে হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে, তবু গণভোটের ফল বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব হয়।
🇨🇴 কলম্বিয়া: শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান
২০১৬ সালে কলম্বিয়ায় সরকার ও ফার্ক বিদ্রোহীদের মধ্যে শান্তিচুক্তি নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Juan Manuel Santos চুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালান। কিন্তু অল্প ব্যবধানে ‘না’ ভোট জয়ী হয়। পরবর্তীতে সরকার সংশোধিত চুক্তি কংগ্রেসের মাধ্যমে পাস করে, যা সরাসরি গণভোটের ফলাফলের প্রতিফলন ছিল না।
🇬🇷 গ্রিস: ঋণসংকট ও শর্ত প্রত্যাখ্যান
২০১৫ সালে গ্রিসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আরোপিত কৃচ্ছ্রসাধন নীতির বিরুদ্ধে গণভোট হয়। প্রধানমন্ত্রী Alexis Tsipras ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেন। ৬১ শতাংশ ভোটার শর্ত প্রত্যাখ্যান করলেও, পরবর্তীতে আর্থিক চাপে সরকার প্রায় একই ধরনের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফলে গণভোটের ফল কার্যত উপেক্ষিত হয়।
🇹🇭 থাইল্যান্ড: সাংবিধানিক গণভোট ও সামরিক প্রভাব
২০১৬ সালে থাইল্যান্ডে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক সরকারের প্রস্তাবিত খসড়া অনুমোদন পায়। তবে সমালোচকরা বলেন, সামরিক প্রভাব ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না। ফলে গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
🇮🇹 ইতালি: সাংবিধানিক সংস্কার প্রত্যাখ্যান
২০১৬ সালে ইতালিতে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Matteo Renzi-এর প্রস্তাব ‘না’ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনি ফলাফলের দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। যদিও এখানে ফল কার্যকর হয়েছিল, তবে এটি দেখায়—গণভোট রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।
🇹🇷 তুরস্ক: বিতর্কিত সাংবিধানিক পরিবর্তন
২০১৭ সালে তুরস্কে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নে গণভোট হয়। প্রেসিডেন্ট Recep Tayyip Erdoğan-এর প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে পাস হয়। বিরোধীরা অনিয়মের অভিযোগ তোলে এবং ফলাফলের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। যদিও ফল কার্যকর হয়, তবে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
উপসংহার
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—যে ফলই আসুক না কেন, তা সবসময় সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ নেয় না। কোথাও আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায়, কোথাও রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ফল বাস্তবায়নে পরিবর্তন আসে।
অতএব, গণভোট গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও, তার কার্যকারিতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের সাংবিধানিক কাঠামো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।
ভিডিও স্টোরি
ফটো স্টোরি