ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নতুন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথের আগেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ১১ দলীয় জোটের ঘোষিত ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ (শ্যাডো ক্যাবিনেট) গঠনের উদ্যোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘোষণা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত রোববার সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফেসবুকে পৃথক পোস্টে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতির কথা জানান। আসিফ মাহমুদ তার পোস্টে লেখেন, “স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।”
বিএনপির ইতিবাচক অবস্থান
এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে ক্ষমতাসীন বিএনপিও। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে; দেশেও এমন কিছু হলে তা ইতিবাচকভাবেই দেখবে বিএনপি। আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের স্বার্থে সংসদে গণতান্ত্রিক আচরণ করবে বিরোধী দল—এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।
যুক্তরাজ্যের আদলে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্য-এর ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে। সেখানে এটি ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় রীতিতে বিরোধীদলীয় নেতা তার দলের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে একটি ছায়া সরকার গঠন করেন, যারা সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এভাবে বিরোধী দল নিজেকে ‘অপেক্ষমাণ বিকল্প সরকার’ হিসেবে প্রস্তুত রাখে।
এই কাঠামোয় সাধারণত সরকারের প্রতিটি মন্ত্রীর বিপরীতে একজন করে ছায়ামন্ত্রী থাকেন। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি, বাজেট ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে সংসদ ও জনপরিসরে প্রশ্ন তোলেন। তবে বিরোধী দল চাইলে নির্দিষ্ট কিছু খাতেও সীমাবদ্ধ রাখতে পারে ছায়া মন্ত্রিসভা।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স ম আলী রেজা কালবেলাকে বলেন, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো নতুন ধারণা নয়। যেখানে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে, সেখানে এটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা। তার মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি করে এবং বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার কাঠামো দেয়।
তিনি বলেন, “সরকার যখন বাজেট বা বড় কোনো নীতি প্রস্তাব উপস্থাপন করবে, তখন ছায়া মন্ত্রিসভার সংশ্লিষ্ট সদস্যরা বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারবেন। এতে জনপরিসরে তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হবে এবং সরকার প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণের সুযোগ পাবে।”
তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সরকারের সহনশীলতা ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, “বিরোধী দল যদি কাজের সুযোগ না পায় বা দায়িত্বশীল আচরণ না করে, তাহলে পার্লামেন্টারি কাঠামোয় তাদের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়বে।”
সুশাসন ও জবাবদিহিতে সম্ভাবনা
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম মনে করেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর কাঠামোবদ্ধ নজরদারি গড়ে উঠবে। তার মতে, “প্রতিটি খাতে দক্ষ ও প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিরা যুক্ত থাকলে সরকারের কার্যক্রম আরও জবাবদিহিমূলক হবে। দুর্নীতির সম্ভাবনা কমবে এবং নীতিনির্ধারণে গুণগত উন্নতি আসবে।”
তবে তিনি বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রায় পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করতে হবে, কিন্তু সাধারণত তাদের জন্য আলাদা আর্থিক সুবিধা বা প্রশাসনিক সহায়তা থাকে না। পর্যাপ্ত লজিস্টিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ছাড়া এ কাঠামো কার্যকরভাবে চালানো কঠিন হতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ছায়া মন্ত্রিসভা একটি নতুন ধারণা। এটি কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পারস্পরিক সদিচ্ছা। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে, বিকল্প নীতির আলোচনার সুযোগ বাড়াবে এবং অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে, ১১ দলীয় জোটের ঘোষিত ছায়া মন্ত্রিসভা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চার ওপর। তবে এটি যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বিতর্ক ও সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে—তা নিয়ে দ্বিমত নেই।
ভিডিও স্টোরি
ফটো স্টোরি