এই তথ্য প্রকাশের পরদিনই নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ঈশ্বর প্রসাদ সতর্ক করে বলেন, চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, চীনের সস্তা পণ্যের জোয়ার উন্নত দেশের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর উৎপাদন খাতের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অন্যদিকে ভিন্নমত পোষণ করেছেন চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সাবেক প্রধান সম্পাদক হু সিজিন। ১৬ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, চীনের এই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তার ভাষায়, এটি প্রমাণ করে যে চীনের অর্থনীতি অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ দিয়ে একে দুর্বল করা সম্ভব নয়। তিনি আরও দাবি করেন, চীন কোনো চাপ প্রয়োগ না করেই সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ব্যবসা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রেকর্ড উদ্বৃত্তের পেছনে দুটি মূল কারণ কাজ করছে—শক্তিশালী রপ্তানি প্রবাহ এবং দুর্বল আমদানি গতি। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমলেও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনা পণ্যের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশেষ করে আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। পাশাপাশি ইউয়ানের মান কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খাতে মুদ্রাসঙ্কোচনের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে।
তবে আমদানির চিত্র ভিন্ন। ২০২৫ সালে চীনের আমদানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি। অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোক্তা চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়া এবং আবাসন খাতে মন্দার কারণে বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে রপ্তানি ও আমদানির ব্যবধান আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিকে কেউ দেখছেন চীনের উৎপাদন শক্তির প্রতিফলন হিসেবে, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার। একদিকে চীনের সাশ্রয়ী পণ্য বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত রপ্তানি নির্ভরতা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
এই ঝুঁকি বিবেচনায় চীনের নীতিনির্ধারকেরাও আমদানি বাড়ানো ও বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ও বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও ইতোমধ্যে আমদানি সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি-আমদানির মধ্যে সুষম উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌরপণ্যের মতো খাতে আন্তর্জাতিক বিরোধ কমাতে বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ হবে নাকি নতুন সংকেত—তা নির্ভর করছে রপ্তানি আয় কতটা অভ্যন্তরীণ চাহিদা জোরদারে কাজে লাগানো যায় এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হয় কি না, তার ওপর।
মন্তব্য করুন