দেশের জাতীয় রাজনীতিতে একটি দৃশ্য প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। নির্বাচন সামনে এলেই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণার সূচনা ঘটে সিলেট থেকে। বিএনপি হোক কিংবা আওয়ামী লীগ—অতীতে প্রায় সব জাতীয় নির্বাচনের আগেই সিলেটকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী যাত্রা।
প্রশ্ন হলো, কেন বারবার সিলেট থেকেই এই রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে দলগুলো?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবেগ, প্রতীকী গুরুত্ব এবং কৌশলগত সুবিধার সমন্বয়।
ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক রেওয়াজ
প্রথম কারণ হিসেবে উঠে আসে রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও রেওয়াজ। স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে সিলেটকে কেন্দ্র করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর ক্ষেত্রে সিলেটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান তার সময় থেকেই সিলেটকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা শুরু করতেন। পরবর্তীতে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে সিলেটকে সূচনাস্থল হিসেবে বেছে নেন। এই ধারাবাহিকতার কারণেই এটি দলীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
দ্বিতীয় বড় কারণ হলো সিলেটের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। সিলেটকে অনেকেই দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের ধর্মীয় আবেগ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
অনেক রাজনৈতিক নেতা মনে করেন, প্রচারণার শুরুতে মাজার জিয়ারত করলে তা শুভ সূচনার প্রতীক হয় এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়।
প্রতীকী ও মিডিয়া গুরুত্ব
তৃতীয় কারণ হলো রাজনৈতিক প্রতীকী মূল্য। সিলেট থেকে প্রচারণা শুরু করার অর্থ হচ্ছে জাতীয় রাজনীতিতে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া—দল মাঠে নেমেছে, লড়াই শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের দৃষ্টিও সহজে সিলেটের দিকে যায়। ফলে প্রথম দিনেই দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে কর্মসূচি।
প্রবাসী সংযোগ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা। সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। তারা সরাসরি ভোট না দিলেও অর্থনৈতিক সহায়তা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সিলেট থেকে শুরু করলে সেই বার্তাটি প্রবাসীদের কাছেও পৌঁছে যায়।
আবেগ ও কৌশলের সমন্বয়
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিলেট নির্বাচন করার পেছনে আবেগ ও কৌশলের মিশ্রণ রয়েছে। সিলেট শুধু একটি শহর নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রতীক। সেই প্রতীক ব্যবহার করেই দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের লড়াই শুরু করতে চায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশলগত সুবিধা—এই চার কারণেই বারবার সিলেট থেকেই জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়।
সিলেট থেকেই শুরু করবেন তারেক রহমান
এই রেওয়াজ ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘ ২১ বছর পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) পুণ্যভূমি সিলেটের মাটিতে পা রাখেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেল ৩টায় সিলেট নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জেলা ও মহানগর বিএনপির আয়োজনে এক সমাবেশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করবেন তিনি।
দলীয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০০৪ সালে বিএনপির বিভাগীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলনে সিলেটে গিয়েছিলেন তারেক রহমান। দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম সিলেট সফরে এলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে এই প্রথম সিলেটে বড় সমাবেশে বক্তব্য দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবারের মতো মাজার জিয়ারতও করেন তিনি।